জেলা সংবাদ টপ নিউজ বাংলাদেশ

বুড়িগঙ্গার লঞ্চডুবিতে মারা যাওয়া ৩০ জনই মুন্সীগঞ্জের

বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবিতে মুন্সীগঞ্জে চলছে শোকের মাতম। মৃত ব্যক্তিদের লাশ বাড়িতে পৌঁছার পর সেখানে এখন শোকে বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। এভাবে এত মৃত্যু মুন্সীগঞ্জবাসী মেনে নিতে পারছে না।

এ পর্যন্ত মুন্সীগঞ্জের ৩০ জনের লাশ শনাক্ত করা হয়েছে। এ লঞ্চ দুর্ঘটনায় মীরকাদিম পৌরসভার কাঠপট্টি, রামসিং, রিকাবীবাজার, পশ্চিমপাড়া, গোয়ালগোনি, বজ্রযোগিনী ও রামপালের যাত্রী ছিলেন বেশি। আর এ সব স্বজনহারা বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।

মুন্সীগঞ্জের রিকাবীবাজারের পশ্চিমপাড়ার মৃত আব্দুল রহিমের ছেলে দিদার হোসেন (৪৫) ছিলেন ঢাকার রহমতগঞ্জের ডালের ব্যবসায়ী। সোমবার সকালে বড় বোনের অসুস্থ স্বামীকে দেখতে আরেক বোন রুমা বেগমকে (৪০) নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে লঞ্চে করে রওনা হন। পথিমধ্যে দুর্ঘটনায় বোনসহ তিনি নিহত হন। স্বজনরা জানান, মাত্র সাত মাস আগে বিয়ে করেছিলেন দিদার।

পশ্চিমপাড়ার পরশ মিয়ার স্ত্রী সুফিয়া বেগম (৫৫) ও তার মেয়ে সুমা বেগম (২৫) যাচ্ছিলেন সদরঘাটের সুমনা ক্লিনিকে ডাক্তার দেখাতে। স্ত্রী সুফিয়া বেগম মারা গেলেও প্রাণে বেঁচে গেছেন মেয়ে সুমা বেগম। তাদের বাড়িতে চলছে এখন শোকের মাতম।

Advertisements

একই এলাকার শাহজাহান শরীফের ছেলে শিপলু শরীফ ঢাকায় যাচ্ছিলেন তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য মালামাল আনতে। কিন্তু লঞ্চ দুর্ঘটনায় তার সলীল সমাধি হলে তার বাড়িতে চলছিল শোকের মাতম।

প্রতিদিন ঢাকায় চাকরিতে এ লঞ্চে যাতায়াত করতেন মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মিরকাদিম পৌরসভার গোয়ালঘুন্নী ও কাজিকসবা গ্রামের যমুনা ব্যাংকের দুই স্টাফ। তারা হচ্ছেন গোয়ালঘুন্নী গ্রামের কাঁলাচান তালুকদারের পুত্র সুমন তালুকদার (৩৩)। তিনি ইসলামপুর যমুনা ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন।

সুমন তালুকদারের ছোট ভাই মো. সোহেল তালুকদার জানান, সোমবার সকাল ৭টার দিকে লঞ্চ ধরার জন্য সে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায়। মৃত্যুকালে সুমন স্ত্রীসহ দুই শিশু সন্তান রেখে গেছেন। পৌনে ৬টার দিকে তার লাশ ঢাকা থেকে বাড়িতে আনা হয়। রাতে কাজি কসবা কবরস্থানে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।

কাজি কসবা গ্রামের ঘুঘুবাড়ির রহিম উদ্দিনের পুত্র শাহাদাৎ (৪৪)। তিনি ঢাকার চকবাজার শাখার যমুনা ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। সেও মৃত্যুকালে স্ত্রীসহ দুই শিশু সন্তান রেখে গেছেন। রামপাল ইউনিয়নের শাখারী বাজার গ্রামে গোলাপ হোসেন ভূঁইয়া (৫২)। তিনি ঢাকার লালকুঠি এলাকায় ব্যবসা করতেন। তিনি মৃত্যুকালে স্ত্রীসহ তিনটি কন্যা সন্তান রেখে গেছেন।

একই ইউনিয়নের সুজানগর গ্রামের জাকির হোসেনের স্ত্রী সুবর্ণা (৩৬) ও পুত্র তামিম (৮) এ লঞ্চডুবিতে মারা গেছেন। তারা সোমবার ঢাকার পিজি হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে সকালে লঞ্চে ঢাকায় যান। তাদের আর ডাক্তার দেখানো হল না।

রামপাল ইউনিয়নের পানাম গ্রামের ময়না (৩৬) ও মুক্তা (১৬) এ লঞ্চে ডুবে মারা যান। তারা দুইজন মা ও মেয়ে বলে খবর পাওয়া গেছে। এ দিকে বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবিতে আবদুল্লাহপুর ছলিমাবাদ এলাকার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনির (৪৫) মারা গেছেন। তিনি লঞ্চ দিয়ে ঢাকা ইসলামপুরের নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছিলেন। স্ত্রীসহ এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তান রয়েছে।

Advertisements

চরকেওয়ার ইউনিয়নের উত্তর গুহেরকান্দি গ্রামের আ. রব মাদবরের ছেলে উজ্জ্বল মাদবর সদরঘাটে লঞ্চ দুর্ঘটনায় মারা যান। মুন্সীগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নয়ন তালুকদারের বড় ভাই সুমন তালুকদার এ ঘটনায় মারা গেছেন।

বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবির ঘটনায় ফারইস্টের অফিসার মো. কনক (৩৬)-এর মৃত্যু হয়েছে। কনক সদর উপজেলার রামপাল ইউনিয়নের ধলাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। তিনি লঞ্চে করে ঢাকায় অফিসে যাচ্ছিলেন। এ দুর্ঘটনায় আব্দুর রউফের বন্ধু সত্যরঞ্জনও মারা গেছেন।

জেলার টঙ্গীবাড়ি থানার আতরকাঠি গ্রামের বেলায়েত হোসেন ওরফে বিল্লাল স্ত্রী মারুফাকে (২৬) গ্যাস্টোলিভার সমস্যার চিকিৎসার জন্য শিশু সন্তান আবু তালহাসহ (২) ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন। সঙ্গে এসেছিল তার ভায়রা আলম বেপারী (৪০)। কিন্তু হাসপাতাল পর্যন্ত যাওয়া হল না তাদের। সকালে বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবিতে প্রাণ হারিয়েছেন তারা।

পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মিটফোর্ট হাসপাতালে বোনের লাশ নিয়ে এসেছেন মারুফার ভাই মো. সুমন। তাদের বাড়ি শ্রীনগর থানার পাড়াগাঁও গ্রামে। কাঁদতে কাঁদতে সুমন জানান, ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে এক চিকিৎসককে দেখানোর জন্যই সকালে ভাগ্নেকে নিয়ে কাঠপট্টি থেকে লঞ্চে ওঠে তার বোন। সঙ্গে আরেক বোন জামাই আলম ব্যাপারী ছিলেন। লঞ্চডুবিতে নদীতে পড়ার পর আর কেউ উঠতে পারেননি। সবাই মারা গেছেন।

এ দিকে একজন দুধ ব্যবসায়ীসহ যারা জীবন নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছেন। তাদেরকে দেখতে তাদের আত্মীয়-স্বজনরা বাড়িতে বাড়িতে ভিড় করছেন। বাড়িতে বাড়িতে আল্লাহর কাছে শোকরিয়া আদায় করে কুরআন তিলাওয়াতের আয়োজন করা হয়েছে।

দুর্ঘটনায় ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে বেঁচে যাওয়া যাত্রী নাজমা আক্তার বলেন, চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যাচ্ছিলাম। লঞ্চটি যে পাশ দিয়ে ডুবেছিল তার বিপরীত পাশের জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসি। চোখের সামনে পরিচিত মুখগুলো মুহূর্তে লাশ হল। এমন ঘটনা সহ্য করা যায় না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ছোট একটা লঞ্চে ১০০ থেকে ১১০ জনের বেশি যাত্রী ছিল। প্রতিদিনই ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি ঢাকায় আসে। এর আগেও লঞ্চটি দুর্ঘটনার স্বীকার হয়। কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অব্যবস্থাপনার কারণেই আজ এত বড় ঘটনা ঘটল।

দুর্ঘটনা থেকে জীবিত ফিরে আসা জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, তার বাড়ি মীরকাদিম পৌরসভার এনায়েতনগরে। রাজধানীর বঙ্গবাজার কাপড়ের দোকানে কাজ করেন তিনি। গত আট বছর ধরে কাঠপট্টি থেকে লঞ্চে করে ঢাকায় আসা-যাওয়া করেন। সোমবার সকালে প্রতিদিনের মতোই মর্নিং বার্ড লঞ্চে করে ঢাকায় যাচ্ছিলেন তিনি। তার সঙ্গে মীরকাদিম পৌর এলাকার প্রায় ১০ জন ছিলেন। কথা আর আড্ডায় তারা লঞ্চটিতে মেতে ছিলেন।

ফরাশগঞ্জ ঘাট এলাকার কাছাকাছি গেলে ঢাকা-চাঁদপুর রুটের ময়ূর-২ তাদের লঞ্চটিকে ধাক্কা দেয়। এতে লঞ্চটি একপাশে কাত হয়ে যায়। পাশের সবাই ছিটকে নদীতে পড়তে থাকেন। তিনিও লঞ্চ থেকে পানিতে পড়ে যান।

তার দেখা মতে, ১০ থেকে ১২ জন যাত্রী তীরে উঠতে সক্ষম হন। আবার পরিচিত অনেকে ডুবে যান। তিনিও প্রায় ডুবে যাচ্ছিলেন। এর মধ্যে আল্লাহর অশেষ রহমতে সাঁতরে তীরে ওঠেন।

তিনি বলেন, যাদের সঙ্গে পাঁচ মিনিট আগেও প্রাণবন্ত আড্ডায় ছিলাম। চোখের সামনে তারা ডুবে গেলেন। এটা কতটা কষ্টের ভাষায় বোঝানো যাবে না।

ফল ব্যবসায়ী রিকাবীবাজার পূর্বপাড়ায় মো. ওমর বলেন, আমি লঞ্চের সামনে সারেংয়ের পাশে ছিলাম। যখন ঘাট দেখা গেল, তখন বেরিয়ে সামনে আসি। শ্যামবাজারের কাছাকাছি এলে দেখি ময়ূর-২ লঞ্চটি সামনের অংশ দিয়ে মর্নিং বার্ডকে ধাক্কা দেয়। সঙ্গে সঙ্গেই মর্নিং বার্ড উল্টে যাচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে আমি জীবন বাঁচাতে নদীতে লাফিয়ে পড়ি। আমার সঙ্গে আরও অনেককেই নদীতে ঝাঁপ দিতে দেখি। অনেকেই পানির নিচ থেকে আমার পা টেনে ধরে। তখন জীবন বাঁচাতে তাদের ছেড়ে পানির উপরে উঠি। এমন সময় দেখি এক নারী হাবুডুবু খাচ্ছেন। তখন তাকে টেনে কাছাকাছি থাকা একটি নৌকার কার্নিশে ধরিয়ে দেই। তারপর আমি সাঁতরে পাড়ে উঠি।

উৎসঃ নয়া দিগন্ত

Drop your comments:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Pin It on Pinterest