বিশ্ব ইতিহাসের মাইলফলক হবে ২০১৫ সাল

এই লেখাটি 3440 বার পঠিত

pm2শেখ হাসিনা : আমরা যখন নতুন বছরে পা রাখছি, তখন ২০১৫ সাল ও পরবর্তী সময়ের একটি ছবি আমাদের থাকা প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অনিশ্চিত নয়। আমাদের ভবিষ্যৎ জানার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই গড়া। ২০১৫ সাল ও এর পরবর্তী সময়ে আমাদের বিশ্ব তেমনই হবে, যেমনটি আমরা স্বপ্ন দেখি। এটি দেখতে কেমন হবে তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে আমাদের কাজের ওপর। এ কারণে আমাদের কথার প্রতিফলন কাজে থাকা উচিত। আর এভাবেই আমরা আমাদের টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণ এবং এ সম্পর্কে আগাম ধারণা দিতে পারি।

২০১৫ সাল-পরবর্তী বিশ্বের জন্য আমাদের রূপকল্পের ফোকাস হওয়া উচিত জনগণ- একটি ন্যায্য ও সুন্দর বিশ্বে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা। এটি মূলত পরিচালিত হবে শান্তির সংস্কৃতি, উন্নয়নের অধিকার, সমান ভবিষ্যতের অধিকার, জনগণ বিশেষ করে নারী ও সুবিধাবঞ্চিতদের ক্ষমতায়ন, সবার জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সুযোগকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে, যা একটি উদার, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক মানবসমাজ নিশ্চিত করবে। এসব রূপকল্প বাস্তবায়ন নির্ভরশীল বিশ্বের প্রতিটি মানুষ, জনসাধারণ ও সরকারের ওপর। উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা দারিদ্র্য ও অজ্ঞতা। আর এ কারণে দারিদ্র্য বিমোচন ও শিক্ষার সুযোগ ২০১৫ সাল-পরবর্তী উন্নয়ন এজেন্ডার সমসাময়িক উন্নয়ন বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা উচিত। বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা ছয় কোটি শিশু, যাদের শতকরা ৭৫ ভাগই কন্যা এবং চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা ১৩০ কোটি মানুষের উন্নতি না ঘটানো পর্যন্ত আমরা কখনোই সত্যিকার অর্থে টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারব না।

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যকে (এমডিজি) জাতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় একীভূত করেছে বাংলাদেশ সরকার। আমাদের ‘রূপকল্প-২০২১’-এও আমরা তা করেছি। এটি জনগণকেন্দ্রিক দর্শন, যা বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভর মধ্যম আয়ের জ্ঞানভিত্তিক দেশে রূপান্তর করবে। আমরা এরই মধ্যে এমডিজি ১, ২, ৩, ৪, ৫ ও ৬ অর্জন করেছি বা অর্জনের পথে আছি। ১৯৯১ সালে যেখানে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল শতকরা ৫৭ ভাগ, তা কমে আজ শতকরা ২৫ ভাগের নিচে নেমে এসেছে। আমি এটিও বলতে চাই, ইতিহাসে এমডিজি দারিদ্র্যবিরোধী সবচেয়ে সফল বৈশ্বিক উদ্যোগ হলেও অঞ্চল ও দেশ বিচারে অগ্রগতি অসম ও ভিন্ন মাত্রার। ১৩০ কোটিরও বেশি মানুষ এখনো চরম দারিদ্র্যসীমার মধ্যে বসবাস করছে। আমরা যখন নতুন উন্নয়ন চ্যালেঞ্জের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছি তখন দারিদ্র্য বিমোচন ২০১৫ সাল-পরবর্তী এজেন্ডার ভিত্তি হওয়া উচিত।

আমাদের বিশ্বের অনেক সমাজে এখনো বিদ্যমান বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যমূলক ও ক্ষতিকর চর্চা মোকাবিলায় কন্যাশিশুর শিক্ষার অধিকার বাধ্যতামূলক- এ বাস্তবতা স্বীকার করে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিটি নীতিতে কন্যাশিশুর শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের বাধা দূর করার ওপর দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে। আমরা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত আমাদের মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করেছি, যা স্নাতক পর্যন্ত উন্নীত করার পরিকল্পনা আছে। অধিকতর দরিদ্র পরিবারগুলোর নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ও বিনা মূল্যে খাবারের ব্যবস্থা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে জেন্ডার সমতা অর্জনে সহায়তা করেছে। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ট্রাস্ট তহবিলসহ অন্যান্য বৃত্তি গ্রহণকারী এক কোটি ২৮ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে শতকরা ৭৫ ভাগই ছিল মেয়ে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শতকরা ৬০ ভাগ পদ নারী শিক্ষকদের জন্য সংরক্ষিত। বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া মেয়েদের সক্ষম করে তুলেছে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা। ২০১১ সালে প্রণীত আমাদের নারী উন্নয়ন নীতিতে শিক্ষা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে।

আমরা নারীদের জন্য ছয়টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছি। এ ছাড়া কলেজগামী সম্ভাব্য নারী উদ্যোক্তাদের আত্মকর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ, জামানত ছাড়া ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া হচ্ছে। এশিয়ার দেশগুলোর মেয়েদের উচ্চতর শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে আমরা চট্টগ্রামে প্রথম এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন প্রতিষ্ঠা করেছি। ২০১৫ সাল-পরবর্তী বিশ্বের জন্য আমাদের রূপকল্প এবং আগামী দশকে সক্রিয় ও সমান ভূমিকা পালনে আমাদের লক্ষ্য মাথায় রেখে আমরা এসব উদ্যোগ নিয়েছি। বাংলাদেশে রাজনীতি, সিভিল সার্ভিস, বিচার বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনী, কারিগরি পেশা, এভিয়েশন (পাইলট) সব পেশা এবং ক্রিকেট, ফুটবলসহ খেলাধুলায় এমনকি পর্বতারোহণে নারীদের হার দ্রুত বাড়ছে। আমাদের মেয়েরা এভারেস্ট পর্বতও জয় করেছে। সম্ভবত বাংলাদেশই বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে প্রধানমন্ত্রী, সংসদের স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা ও সংসদ উপনেতা- সবাই নারী। পশ্চিমা অনেক সমাজও এমন সমন্বয় ঘটাতে পারেনি। গত তিন বছরে আমাদের নারী শ্রমশক্তি ২৪ থেকে বেড়ে ৩৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা ৬.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হার অর্জনে ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। পুরোপুরি বৈশ্বিক এই খাতের শতকরা ৯০ ভাগই আমাদের তরুণ কর্মশক্তিপূর্ণ নারীকর্মীর শ্রমে চলে। আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে এবং একই সঙ্গে ভুল থেকে শিখি। আমাদের অতীত আমাদের আরো শক্তিশালী করে। অতীতের শিক্ষা আমাদের মনে রাখতে হবে এবং ওই শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে আমাদের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘এখন’ যেখানে আমরা বসবাস করছি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে ‘আগামীকাল’, যা আমরা আমাদের শিশুদের জন্য রেখে যাব।

মুক্তকলাম/ বাংলা এক্সপ্রেস/ ১০ জানুয়ারি ২০১৫/ সাহরা

বিশেষ প্রতিবেদন



Contact us

E-mail: news@banglaexpress.ae(For News)
advt@banglaexpress.ae(For Ad)

Carrier

Text to Speech is becoming more and more wide spread in applications, mobile or not. This technology allows interaction of the application with the user on a much more personal level.

Join us

Copyright © Bangla Express 2015
Design & Development By: