এফবিআই প্রধানকে বরখাস্ত করলেন ট্রাম্প

এই লেখাটি 335 বার পঠিত

ভোটের আগে হিলারি ক্লিনটনের ইমেইল কেলেঙ্কারি নিয়ে তদন্তকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের প্রধান জেমস কোমিকে বরখাস্ত করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বিবিসি জানিয়েছে, অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ সেশনসের সুপারিশের ভিত্তিতেই প্রসিডেন্ট ট্রাম্প এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে হোয়াইট হাউজের ভাষ্য।

তবে ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের সঙ্গে রাশিয়ার যোগাযোগ নিয়ে তদন্ত করছিলেন বলেই জেমস কোমিকে বরখাস্ত হতে হল।

গত সপ্তাহে কংগ্রেসের শুনানিতে হিলারির ইমেইল নিয়ে কোমি পুরোপুরি সঠিক তথ্য দেননি- এমন তথ্য বেরিয়ে আসার পর হোয়াইট হাউজের এই পদক্ষেপ এল।

কোমিকে লেখা এক চিঠিতে ট্রাম্প বলেছেন, “অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আমিও একমত যে আপনি আর এফবিআইয়ের নেতৃত্ব দেওয়ার উপযুক্ত নন।”

জেফ সেশনস বলেছেন, ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস সর্বোচ্চ পর্যায়ের শৃঙ্খলা, সততা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। এ কারণেই ওই পদে নতুন মুখ প্রয়োজন।

সেই নতুন মুখের খোঁজে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়ে গেছে বলে হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে।

মঙ্গলবার কোমি যখন লস অ্যাঞ্জেলেসে এফবিআই এজেন্টদের সামনে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, তখন একজন এসে তার হাতে একটি নোট ধরিয়ে দিয়ে যান। সেখানেই জানানো হয়, তার আর চাকরি নেই।

বিবিসি লিখেছে, ওই নোট পড়ে ৫৬ বছর বয়সী কোনি হেসে ওঠেন, প্রথমে তিনি ওই চিরকুটকে রসিকতা ভেবেছিলেন।

রয়টার্স জানিয়েছে, জেমস কোমি এফবিআইয়ের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে।

এফবিআই প্রধানরা সাধারণত ১০ বছরের জন্য দায়িত্ব পান। সেই হিসেবে তার মেয়াদ পূর্ণ হতে আরও ছয় বছর বাকি ছিল।

কোমিকে এমন আকস্মিকভাবে বরখাস্ত করায় বিস্মিত হয়েছেন অনেকেই। বিশেষ করে হিলারির ইমেইল তদন্তের বিষয়টি নিয়ে তাকে বরখাস্ত করার যুক্তি অনেকের কাছেই বিস্ময়কর ঠেকেছে। কারণ, ট্রাম্পই তার নির্বাচনী প্রচারের শেষদিনগুলোতে কোমির ইমেইল তদন্তের বিষয়টি নিয়ে প্রশংসা করেছিলেন।

কিন্তু মঙ্গলবার মার্কিন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রড রোসেনস্টেইন বলেন, কোমি তদন্তের শেষ দিকে এসে যা করেছেন সেটি তিনি সমর্থন করেন না। কোমি যে ভুল করেছেন সে ব্যাপারে প্রায় সবাই একমত পোষণ করবে বলে জানান রোসেনস্টেইন।

বিচারপ্রক্রিয়া ছাড়াই তদন্ত বন্ধ করার কথা বলে এবং হিলারি সম্পর্কে অযথাই ‘মর্যাদাহানিকর তথ্য’ দিয়ে কোমি ভুলের পাল্লা ভারি করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ইমেইল তদন্ত নিয়ে কি করেছিলেন কোমি?

হিলারি ক্লিনটন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে অফিসের কাজে ব্যক্তিগত ইমেইল সার্ভার ব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি তদন্ত করা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন কোমি।

২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি তদন্তকাজের বিষয়টি নিয়ে দুবার দু’রকম ঘোষণা দেন। একবার জুলাইয়ে তিনি বলেন, বিচার ছাড়াই তদন্তকাজ বন্ধ করা উচিত। কিন্তু পরে নির্বাচনের মাত্র ১১ দিন আগে নতুন করে পাওয়া আরও কিছু ইমেইল নিয়ে আবার তদন্ত পুনরায় শুরুর ঘোষণা দেন তিনি।

তার এ ঘোষণার কারণে নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হিলারির হেরে যাওয়ার পট প্রস্তুত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ডেমোক্র্যাটরা। হিলারি নিজেও তার হারের জন্য এফবিআই কে দুষেছেন।

তদন্ত নিয়ে কোমি ভুল কি তথ্য দিয়েছিলেন?

কোমি ৩ মে সিনেট বিচারবিভাগীয় কমিটিকে বলেছিলেন, হিলারির শীর্ষ সহযোগী হুমা আবেদিন শত শত, হাজার হাজার ইমেইল তার তৎকালীন স্বামী এন্থনি ওয়েইনারের কাছে ফরোয়ার্ড করে পাঠিয়েছিলেন। যেগুলোর কয়েকটিতে গোপন তথ্য ছিল।

কিন্তু পরে এফবিআই কংগ্রেসে চিঠি পাঠিয়ে জানায় যে বিষয়টি নিয়ে কোমি সঠিক তথ্য দেননি।

এফবিআই জানায়, ইমেইলের সংখ্যা বাড়িয়ে বলেছিলেন কোমি। শত শত, হাজার হাজার নয় বরং অল্প সংখ্যক ইমেইলই ফরওয়ার্ড করা হয়েছিল ওয়েইনারের কাছে। এগুলোর কোনওটিতেই গোপন তথ্য ছিল বলে চিহ্নিত করা হয়নি। তবে পরবর্তীতে কয়েকটি ইমেইলের তথ্য গোপন বলে ধারণা করা হয়েছিল।

তাছাড়া, হিলারির সহযোগী আবেদিন নিয়মিতই ইমেইল প্রিন্ট করার জন্য ওয়েইনারকে ফরওয়ার্ড করতেন বলে কোমি কংগ্রেসে যে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তাও সঠিক নয় বলে জানিয়েছে এফবিআই। ওয়েইনারের ল্যাপটপে পাওয়া ৪৯ হাজার ইমেইল এর বেশিরভাগই তার কর্মক্ষেত্রের ব্ল্যাকবেরি ডিভাইস থেকে অটোমেটিক ব্যাকআপয়ের মাধ্যমে তার কাছে গিয়েছিল।

কোমি বরখাস্ত হওয়া নিয়ে রিপাবলিকানরা কি বলছে?

কোমিকে বরখাস্তের ট্রাম্পের পদক্ষেপে কংগ্রেসের রিপাবলিকানদের মধ্যে বিভেদ দেখা দিয়েছে। কোমিকে যে সময়ে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং যে যুক্তি দেখানো হয়েছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট নন রিপাবলিকানরা।

বেশিরভাগ রিপাবলিকানই ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ এবং হাতাশা প্রকাশ করেছেন। আর ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ঠিক বলে মত দিয়েছেন খুব কম সংখ্যক রিপাবলিকান।

সিনেট গোয়েন্দা কমিটির প্রধান রিচার্ড বার বলেছেন, কোমিকে বরখান্ত করার যে যুক্তি দেখানো হয়েছে এবং যে সময়ে তাকে সরানো হল তাতে তিনি উদ্বিগ্ন।

নেব্রোস্কার সিনেটর বেন সেসেও কোমিকে বরখাস্ত করার সময় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ওদিকে, মিশিগানের কনজারভেটিভ কংগ্রেস সদস্য জাস্টিন অ্যামাশ বলেছেন, তিনি রাশিয়ার বিষয়টি তদন্তের জন্য একটি নিরপেক্ষ কমিশন প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছেন।

টেনেসির সিনেটর বব কোরকার বলেছেন, ট্রাম্প যে সময়ে কোমিকে সরালেন তাতে কিছু প্রশ্নের অবতারণা হবে।  অন্যদিকে, সিনেটর জন ম্যাককেইন বলছেন, তিনি কোমিকে সরানোর ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে হতাশ।

সিনেটর জেমস ল্যাঙ্কফোর্ড বলেছেন, তিনি এখনও কোমিকে বরখাস্ত করার বিষয়টি নিয়ে কিছু প্রশ্নের জবাব চান এবং বরখাস্তের কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান।

রাশিয়া নিয়ে তদন্তের কি হবে?

ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারে রাশিয়ার হাত ছিল কিনা তা নিয়ে তদন্ত চলার সময়টিতেই আকস্মিকভাবে এফবিআই পরিচালক কোমি বরখাস্ত হওয়ায় এ বিষয়ক তদন্ত কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়ল।

আগের যে কোনও সময়ের চেয়ে এখন রাশিয়ার বিষয়টি নিয়ে অনেক বেশি নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন পড়বে। কারণ, ট্রাম্প এফবিআই এর তদন্তে প্রভাব খাটানোর জন্য কোমিকে হুট করে বরখাস্ত করেছেন বলে ইতোমধ্যেই অভিযোগ তুলেছে ডেমোক্র্যাটরা।

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেটও ঠিক এ অভিযোগটিই খতিয়ে দেখছে।

সিনেট সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা চাক শুমার প্রশ্ন তুলে বলেছেন, “রাশিয়ার বিষয়টি নিয়ে এফবিআইয়ের তদন্ত কি ক্রমশই প্রেসিডেন্টকে ঘিরেই ঘনীভূত হচ্ছিল? নাহলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোমিকে বরখাস্তের জন্য এ সময়টিই বেছে নিলেন কেন? হিলারির ইমেইল তদন্ত নিয়ে প্রশাসনের আপত্তি থেকে থাকলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতা নেওয়ার পরপরই তো কোমিকে বরখাস্ত করতে পারতেন। তখন তিনি তা করেননি। আজ তা ঘটল কেন?”

অনেকেই আবার কোমিকে বরখাস্তের ঘটনার সঙ্গে সেই প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের আমলে ওায়াটারগেট কেলেঙ্কারির সময়কার ঘটনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির সময় নিক্সনও তদন্তকারী নিরপেক্ষ বিশেষ কৌঁসুলিকে বরখাস্ত করেছিলেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য বরাবরই রাশিয়া নিয়ে অভিযোগকে ‘ভুয়া খবর’ বলে দাবি করে এসেছেন।

তবে তদন্ত চলার সময়ে কোমিকে সরানোর ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এখন রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চালানোর জন্য একজন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও শুমার বলছেন, নিরপেক্ষ একজন কৌঁসুলি নিয়োগ দিতে না পারলে প্রতিটি মার্কিনিরই ধারণা জন্মাবে যে, রাশিয়ার বিষয়টি ধামাচাপা দিতেই কোমিকে সরিয়েছেন ট্রাম্প।

বিশেষ প্রতিবেদন



Contact us

E-mail: news@banglaexpress.ae(For News)
advt@banglaexpress.ae(For Ad)

Carrier

Text to Speech is becoming more and more wide spread in applications, mobile or not. This technology allows interaction of the application with the user on a much more personal level.

Join us

Copyright © Bangla Express 2015
Design & Development By: