গরিবের হক লুটেপুটে খেতে চাচ্ছে চামড়া ব্যবসায়ীরা

এই লেখাটি 2606 বার পঠিত

camra oচামড়ার দাম সরকার কখনো নির্ধারণ করে না। সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ট্যানারি মালিকরাই দাম নির্ধারণ করে থাকে। লেখার অপেক্ষা রাখে না, কুরবানীর চামড়ার মূল মালিক মাদরাসার গরিব তালিবে ইলম তথা গরিব মানুষ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, তেলের দাম কমে যাওয়া, চীনের শেয়ারবাজারের পতনসহ নানা কারণে বিশ্ববাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের দাম কমে গেছে। আর তাতেই রফতানী কম হচ্ছে এসব পণ্যের। ফলে গত কুরবানীর ঈদে যে চামড়া কিনেছে ট্যানারি মালিকরা, তার অর্ধেকই অবিক্রীত রয়ে গেছে, এসব অজুহাতে গরিবের হক্বে এবারো লুটেপুটে খেতে চাচ্ছে চামড়া ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০১৪ সালের প্রক্রিয়াজাত চামড়ার ৪০-৫০ ভাগ এখনো তাদের কাছে রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও চামড়ার দাম কম। তাই এবার ২০১৪ সালের চেয়ে কম দামে চামড়া কিনতে হবে। তাদের দেয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ফেব্রুয়ারিতে (২০১৫) প্রতি পাউন্ড চামড়ার মূল ছিল ১০৬ দশমিক শূন্য ছয় সেন্ট। বর্তমানে এর দাম ৭১ সেন্ট।  জানা গেছে, প্রতিবছরই চামড়ার দাম নির্ধারণ নিয়ে টালবাহানা করে ব্যবসায়ীরা। বারবারই দাম নির্ধারণের বিপক্ষে তাদের অবস্থান। তবে শেষ সময়ে এসে তাড়াহুড়ো করে তারা একটা দাম ধরে দেয়। প্রতিবছর কুরবানীর পশুর দাম বাড়লেও ট্যানারি মালিকরা সিন্ডিকেট করে বছরের পর বছর চামড়ার দাম কমিয়েই যাচ্ছে।

চামড়ার দাম নির্ধারণ পর্যালোচনা দেখা যায়, ২০১৪ সালে রাজধানীতে প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়া ব্যবসায়ীরা কিনে ৭০ থেকে ৭৫ টাকায়। ঢাকার বাইরে কেনে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়। এর আগের বছর ঢাকায় প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ছিল ৮৫-৯০ টাকা। আর ঢাকার বাইরে ছিল ৭৫-৮০ টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে শুধু গরুর চামড়া কিনতে গিয়ে রাজধানীতেই প্রতি বর্গফুট ১৫ টাকা কম নির্ধারণ করেছে ব্যবসায়ীরা। এবার কুরবানী হওয়া গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়া ৪৫-৫০ টাকা, ঢাকার বাইরের চামড়া ৪০-৪৫ টাকায় কিনবে বলে ঠিক করেছে চামড়াসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। আর প্রতি বর্গফুট মহিষের চামড়া ৩৫ টাকা, খাসির চামড়া ২০-২৫ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম ১৫-২০ টাকা ঠিক করা হয়েছে।

তবে ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানী কমার কথা বললেও রফতানী উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। সংস্থাটির হিসেবে গত তিন বছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানী প্রায় তিনগুণ হয়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে এ খাতে রফতানী হয়েছে ৪২৯ দশমিক ৫২ মিলিয়ন ডলার, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৫৩৫ দশমমিক ৪৫ মিলিয়ন ডলার এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এক হাজার ১২৪ দশমিক ১৭ মিলিয়ন ডলার। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩৯৭ দশমিক ২৮ মিলিয়ন ডলারে। এ হিসাবে ৩ বছরে রফতানী আয় বেড়েছে ২২৫ শতাংশ।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশে সারাবছর যে পরিমাণ চামড়া সংগৃহীত হয় তার অর্ধেকই আসে কুরবানীর ঈদে। এ বছরের লক্ষ্যমাত্রা ৬৫ লাখ গরুর চামড়া।  এদিকে কারখানার মালিকরা জানিয়েছে, পাড়া-মহল্লার মৌসুমী ব্যবসায়ীরা কোনো কিছু না বুঝেই ঘোষিত মূল্যে চামড়া কেনে। কিন্তু এরপর কয়েক হাত ঘুরতে গিয়ে দাম অনেক বেড়ে যায়। অথচ কুরবানীদাতারা উপযুক্ত দাম পায় না। ক্ষতিগ্রস্ত হয় গরিব মানুষগুলো। অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগীরা মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে বিদায় হয়, খরচ বেড়ে যায় কারখানার। আমরা মনে করি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি মহল্লাভিত্তিক ক্রয় কেন্দ্র বসানোর দরকার, অন্যথায় গরিব মানুষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি চামড়া পাচার হয়ে যেতে পারে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, চামড়ার দাম কমলে ফড়িয়া, আড়তদার, ট্যানারী মালিক তথা কুরবানীদাতা নয়, গরিব-দুস্থ মানুষই সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়ে। সম্মানিত ইসলামী আহকাম মতে, পবিত্র কুরবানী উনার পশুর চামড়ার বিক্রয়কৃত টাকা ছহীহ দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের, ইয়াতীমখানা ও গরিব-দুঃস্থদের দান করাটাই নিয়ম। পবিত্র কুরবানী উনার চামড়া থেকে প্রাপ্ত অর্থে এসব প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক খরচের একটি বড় অংশ নির্বাহ করা হয়। কিন্তু চামড়ার দাম প্রতি বছর কমতে থাকায় প্রতিষ্ঠান চালাতে হিমশিম খেতে হয়। এ ব্যাপারে আমরা সরকারের যথাযথ হস্তক্ষেপ কামনা করি।

উল্লেখ্য, চামড়া ব্যবসায়ীরা সারা বছর অপেক্ষায় থাকে পবিত্র কুরবানী উনার ঈদের জন্য। কাঁচা চামড়া বেচাকেনার রমরমা ব্যবসা হয় এ সময়। অথচ বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা প্রতি বছরই কাঁচা চামড়া কম দামে কেনার নানা কৌশল করে। অন্যদিকে ভারতের ব্যবসায়ীরা ২০ থেকে ২৫ টাকা বেশি দাম দিয়ে অগ্রিম চামড়া কিনে রাখে। ভারতের গরুর চামড়ার গুণগত মান ভালো না থাকায় নিজের দেশের কারখানায় সে দেশের পশুর চামড়ার চাহিদা অতি সামান্য। কিন্তু আমাদের দেশী এবং ক্রস গরুর চামড়ার মান ভালো থাকায় ভারতসহ বিশ্ববাজারে এসব চামড়া থেকে তৈরি চামড়াজাত পণ্যের ভালো চাহিদা রয়েছে। ভারতের ব্যবসায়ীরা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে নানা কৌশলে বাংলাদেশ থেকে চামড়া পাচার করে তাদের কারখানায় বিভিন্ন ডিজাইনের চামড়াজাত পণ্য তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানী করছে। এতে বাংলাদেশের চামড়ার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এবার ঢাকার পুলিশ কমিশনার বলেছে, ‘ঈদের পর তিন দিন চামড়াবাহী কোনো ট্রাক রাজধানীর বাইরে যেতে দেয়া হবে না। তবে এসময় চামড়াবাহী ট্রাক রাজধানীতে প্রবেশ করতে পারবে।’

প্রসঙ্গত আমরা মনে করি, শুধু রাজধানীতে কিছু পাহারাদার বসিয়ে চামড়া পাচার বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য নেয়া প্রয়োজন সারা দেশব্যাপী সমন্বিত ব্যবস্থা। পাশাপাশি চামড়ার দাম যাতে যথাযথ মূল্যে বিক্রি হয় সে ব্যবস্থা করা। মিথ্যা প্রচারণার বিপরীতে প্রকৃত তথ্য সচেতন করা। এবং সিন্ডিকেট নির্মূল করে সাধারণের স্বার্থ রক্ষা করা।

মিনার সাওয়ারি

From : sowari.to.unity@gmail.com

মুক্তকলাম/ বাংলা এক্সপ্রেস/ ২৭ সেপ্টেম্বর  ২০১৫/ সাহরা

বিশেষ প্রতিবেদন



Contact us

E-mail: news@banglaexpress.ae(For News)
advt@banglaexpress.ae(For Ad)

Carrier

Text to Speech is becoming more and more wide spread in applications, mobile or not. This technology allows interaction of the application with the user on a much more personal level.

Join us

Copyright © Bangla Express 2015
Design & Development By: